নজরুল গীতি

কবি সবার কথা কইলে

কবি, সবার কথা কইলে, এবার নিজের কথা কহ।১
(কেন) নিখিল ভুবন অভিমানের আগুন দিয়ে দহ।।

কে তোমারে হান্‌ল হেলা, কবি!
(হায়!) সুরে সুরে আঁক কি গো সেই বেদনার ছবি?
কা’র বিরহ রক্ত ঝরায় বক্ষে অহরহ।।

কোন্‌ ছন্দময়ীর ছন্দ দোলে আমার গানে গানে,
তোমার সুরের স্রোত ব’য়ে যায় কাহার প্রেমের টানে গো –
কাহার চরণ পানে?

কাহার গলায় ঠাঁই পেল না ব’লে
(তব) কথার মালা ব্যথার মত প্রতি হিয়ায় দোলে,
(তোমার) হাসিতে যে বাঁশি বাজে, সে ত’ তুমি নহ।।

নজরুল গীতি

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল
আজো তার ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি তন্দ্রাতে বিলোল।।

আজো হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী বায় ঝুরছে নিশি-দিন
আসেনি দখনে হাওয়া গজল গাওয়া মোমাছি বিভোল।।

কবে সে ফুল কুমারী ঘোমটা চিরি’, আসবে বাহিরে
শিশিরের স্পর্শ-সুখে ভাঙবে রে ঘুম রাঙবে রে কপোল।

ফাগুনের মুকুল-জাগা দু’কূল ভাঙা আসবে ফুলেল বান
কুঁড়িদের ওষ্ঠ পুটে লুটবে হাসি ফুটবে গালে টোল।।

কবি তুই গন্ধে ভুলে ‘ ডুবলি জলে কূল পেলিনে আর
ফুলে তোর বুক ভ’রেছিস আজকে জলে ভররে আঁখির কোল।।

নজরুল গীতি

নম: নম: নম: বাংলাদেশ মম

নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম
চির-মনোরম চির-মধুর।
বুকে নিরবধি বহে শত নদী
চরণে জলধির বাজে নূপুর॥

গ্রীষ্মে নাচে বামা কাল-বোশেখী ঝড়ে,
সহসা বরষাতে কাঁদিয়া ভেঙে পড়ে,
শরতে হেসে চলে শেফালিকা-তলে
গাহিয়া আগমনী গীতি বিধুর॥

হরিত অঞ্চল হেমন্তে দুলায়ে
ফেরে সে মাঠে মাঠে শিশির-ভেজা পায়ে,
শীতের অলস বেলা পাতা ঝরার খেলা
ফাগুনে পরে সাজ ফুল-বধূর॥

এই দেশের মাটি জল ও ফুলে ফলে
যে রস যে সুধা নাহি ভূমন্ডলে,
এই মায়ের বুকে হেসে খেলে সুখে
ঘুমাব এই বুকে স্বপ্নাতুর॥

আধুনিক

দুটি পাখী দুটি তীরে

দুটি পাখি দুটি তীরে
মাঝে নদী বহে ধীরে।

একই তরু শাখা পরে-
ছিল বাসা লীলা ছলে,
অজানা সে কোন ঝড়ে-
ভেঙে নিল বাসাটিরে।

বিধাতার আভিশাপ
নিয়তির হল জয়,
ছিঁড়িল বীণার তার
মুছে গেল পরিচয়।

ছিল যেথা আলো হাসি
ফুলফল মধু বাঁশি,
আজি সেথা কিছু নাহি
বায়ু কেঁদে যায় নীড়ে।

নজরুল গীতি

পরাণ প্রিয় কেন এলে অবেলায়

রান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়।
শীতল হিমেল বায়ে ফুল ঝরে যায়॥

সেদিনও সকাল বেলা
খেলেছি কুসুম-খেলা,
আজি যে কাঁদি একেলা
এ ভাঙা মেলায়,
কেন এলে অবেলায়॥

ক্লান্ত দিবস দূরে
কাঁদিছে পিলুর সুরে,
কেন শত পথ ঘুরে
আসিলে হেথায়॥

নজরুল গীতি

এত জল ও কাজল চোখে

এত জল ও – কাজল চোখে
পাষানী আনলে বল কে ?
টলমল জল মোতির মালা
দুলিছে ঝালর –পলকে ।।

দিল কি পুব – হাওয়াতে দোল ,
বুকে কি বিঁধিল কেয়া ?
কাঁদিয়া কুটিরে গগন
এলায়ে ঝামর অলকে।।

চলিতে পৈচি কি হাতের
বাধিল বৈচি কাটাতে ?
ছাড়াতে কাচুলির কাঁটা
বিধিল হিয়ার ফলকে ।।

যে দিনে মোর দেওয়া – মালা
ছিঁড়িলে আনমনে সখি ,
জড়াল যুঁই – কিসুমী – হাড়
বেণীতে সেদিন গুলো কে ।।

যে পথে নীর ভরণে যাও
বসে রই সে পথ – পাশে
দেখি নিত কার পানে চাহি
কলসীর সলিল ছলকে ।।

মুকুলী মন সেধে সেধে
কেবলি ফিরিনু কেদে ,
সরসীর ঢেউ পলায় ছুটি
না ছুতেই নলিন – নোলকে ।।

বুকে তোর সাত সাগরের জল
পিপাসা মিটল না কবি ,
ফটিক – জল ! জল খুঁজিস যেথায়
কেবলি তড়িৎ ঝলকে ।।

নজরুল গীতি

ফুল-ফাগুনের এলো মরশুম বনে বনে লাগলো দোল

ফুল-ফাগুনের এলো মরশুম বনে বনে লাগলো দোল।
কুসুম-সৌখিন দখিন হাওয়ার চিত্ত গীত-উতরোল।।

অতনুর ঐ বিষ-মাখা শর নয় ও দোয়েল শ্যামার শিস,
ফোটা ফুলে উঠল ভ’রে কিশোরী বনের নিচোল।।

গুলবাহারের উত্তরী কার জড়াল তরু-লতায়,
মুহুমুহু ডাকে কুহু তন্দ্রা-অলস, দ্বার খোল।

রাঙা ফুলে ফুল্ল-আনন দোলে কানন-সুন্দরী,
বসন্ত তার এসেছে আজ বরষ পরে পথ-বিভোল।।

নজরুল গীতি

আজি নন্দলাল মুখচন্দ নেহারি

আজি নন্দলাল মুখচন্দ নেহারি
অধীর আনন্দে অন্তর কাঁপে
ঝরে প্রেমবারি ।।

বকুল-বন হরষে
ফুলদল বরষে
গাহে রাধা শ্যাম নাম হরি-
চরণ হেরি শুকসারি ।।

রাগ : খাম্বাবতী, তাল : ঝাঁপতাল

নজরুল গীতি

চাঁদের মত নীরবে এসো প্রিয়

চাঁদের মত নীরবে এসো প্রিয় নিশীথ রাতে।
ঘুম হয়ে পরশ দিও হে প্রিয়, নয়ন-পাতে।।

তব তরে বাহির-দুয়ার মম
খুলিবে না এ-জনমে প্রিয়তম,
মনের দুয়ার খুলি’ গোপনে এসো বিজরিত রহিও স্মৃতির সাথে।।

কুসুম-সুরভি হ’য়ে এসো নিশি পবনে,
রাতের পাপিয়া হয়ে পিয়া পিয়া ডাকিও বন-ভবনে।

আঁখি জল হয়ে আঁখিতে আসিও
বেণুকার সুর হয়ে শ্রবণে ভাসিও,
বিরহ হ’য়ে এসো হে চির-বিরহী আমার অন্তর-বেদনাতে।।

নজরুল গীতি

প্রদীপ নিভায়ে দাও উঠিয়াছে চাঁদ

প্রদীপ নিভায়ে দাও, উঠিয়াছে চাঁদ।
বাহুর ডোর আছে, মালায় কী সাধ?

ফুল আনিয়ো না ভবনে
কেশের সুবাস তব ঘনাক মনে,
হৃদয়ের লাগি মোর হৃদয় কাঁদে
চন্দন লাগে বিস্বাদ॥

খোলো গুন্ঠন, ফেলে দাও আভরণ,
হাতে রাখো হাত, তোলো আনত নয়ন।

বাহিরে বহুক বাতাস
বক্ষে লাগুক মোর তব ঘন শ্বাস
চম্পার ডালে বসে মোদেরে দেখে
কুহু আর পাপিয়ায় করুক বিবাদ॥

নজরুল গীতি

পলাশ ফুলের গেলাস ভরি

পলাশ ফুলের গেলাস ভরি’
পিয়াব অমিয়া তোমারে প্রিয়া
চাঁদিনী রাতের চাঁদোয়া তলে
বুকের আঁচল দিব পাতিয়া।।

নয়ন-মণির মুকুরে তোমার
দুলিবে আমার সজল ছবি
সবুজ ঘাসের শিশির ছানি
মুকুতা মালিকা দিব গাঁথিয়া।।

ফিরোজা আকাশ আবেশে ঝিমায়
দীঘির বুকে কমল ঘুমায়
নীরব যখন পাখির কূজন আমরা দু’জন রব জাগিয়া।।

রবীন্দ্র সংগীত

জীবনে আমার যত আনন্দ

জীবনে আমার যত আনন্দ পেয়েছি দিবস-রাত
সবার মাঝারে আজিকে তোমারে স্মরিব জীবননাথ ॥

যে দিন তোমার জগত নিরখি হরষে পরান উঠেছে পুলকি
সে দিন আমার নয়নে হয়েছে তোমার নয়নপাত ॥

বারে বারে তুমি আপনার হাতে স্বাদে সৌরভে গানে
বাহির হইতে পরশ করেছ অন্তরমাঝখানে।

পিতা মাতা ভ্রাতা সব পরিবার, মিত্র আমার, পুত্র আমার,
সকলের সাথে প্রবেশি হৃদয়ে তুমি আছ মোর সাথ ॥

নজরুল গীতি

মরম কথা গেল সই মরমে মরে

মরম-কথা গেল সই মরমে মরে।
শরম বারণ যেন করিল চরণ ধরে॥

ছল করে কত শত সে মম রুধিত পথ,
লাজ ভয়ে পলায়েছি সে ফিরেছে ব্যথাহত,
অনাদরে প্রেম-কুসুম গিয়াছে মরে॥

কত যুগ মোর আশে বসে ছিল পথ পাশে,
কত কথা কত গান জানায়েছে ভালোবাসে,
শেষে অভিমানে নিরাশে গিয়াছে সরে॥