রবীন্দ্র সংগীত

আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই

আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই
তখন যাহা পাই
সে যে আমি হারাই বারে বারে॥

তিনি যখন ভিক্ষা নিতে আসেন আমার দ্বারে
বন্ধ তালা ভেঙে দেখি আপন-মাঝে গোপন রতনভার,
হারায় না সে আর॥

প্রভাত আসে তাঁহার কাছে আলোক ভিক্ষা নিতে,
সে আলো তার লুটায় ধরণীতে।

তিনি যখন সন্ধ্যা-কাছে দাঁড়ান ঊধর্ব করে, তখন স্তরে স্তরে
ফুটে ওঠে অন্ধকারের আপন প্রাণের ধন,
মুকুটে তাঁর পরেন সে রতন॥

রবীন্দ্র সংগীত

আমার বেলা যে যায় সাঁঝ-বেলাতে

আমার বেলা যে যায় সাঁঝ-বেলাতে
তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে॥

একতারাটির একটি তারে গানের বেদন বইতে নারে,
তোমার সাথে বারে বারে হার মেনেছি এই খেলাতে
তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে॥

এ তার বাঁধা কাছের সুরে,
ঐ বাঁশি যে বাজে দূরে।

গানের লীলার সেই কিনারে যোগ দিতে কি সবাই পারে
বিশ্বহৃদয়পারাবারে রাগরাগিণীর জাল ফেলাতে–
তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে ।।

রবীন্দ্র সংগীত

এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর !

এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর !
পুণ্য হল অঙ্গ মম, ধন্য হল অন্তর সুন্দর হে সুন্দর॥
আলোকে মোর চক্ষুদুটি মুগ্ধ হয়ে উঠল ফুটি,
হৃদ্‌গগনে পবন হল সৌরভেতে মন্থর সুন্দর হে সুন্দর॥
এই তোমারি পরশরাগে চিত্ত হল রঞ্জিত,
এই তোমারি মিলনসুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।
তোমার মাঝে এমনি ক’রে নবীন করি লও যে মোরে
এই জনমে ঘটালে মোর জন্ম-জনমান্তর সুন্দর হে সুন্দর॥

রবীন্দ্র সংগীত

একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ

একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে,
আনন্দবসন্তসমাগমে॥
বিকশিত প্রীতিকুসুম হে
পুলকিত চিতকাননে॥
জীবনলতা অবনতা তব চরণে।
হরষগীত উচ্ছ্বসিত হে
কিরণমগন গগনে॥

রবীন্দ্র সংগীত

আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও

আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও॥

যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ-আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।
বিশ্বহৃদয়-হতে-ধাওয়া আলোয়-পাগল প্রভাত-হাওয়া,
সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও॥

আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও,
মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।

আমার পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান–
তার নাইকো বাণী, নাইকো ছন্দ, নাইকো তান।
তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁইয়ে দাও।
বিশ্বহৃদয়-হতে-ধাওয়া প্রাণে-পাগল গানের হাওয়া,
সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও॥

রবীন্দ্র সংগীত

নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্‌বৃত অম্বর

নীল- অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্‌বৃত অম্বর
হে গম্ভীর !
বনলক্ষ্মীর কম্পিত কায়, চঞ্চল অন্তর–
ঝঙ্কৃত তার ঝিল্লির মঞ্জীর
হে গম্ভীর॥

বর্ষণগীত হল মুখরিত মেঘমন্দ্রিত ছন্দে,
কদম্ববন গভীর মগন আনন্দঘন গন্ধে–
নন্দিত তব উৎসবমন্দির
হে গম্ভীর॥

দহনশয়নে তপ্ত ধরণী পড়েছিল পিপাসার্তা,
পাঠালে তাহারে ইন্দ্রলোকের অমৃতবারির বার্তা।

মাটির কঠিন বাধা হল ক্ষীণ, দিকে দিকে হল দীর্ণ–
নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায় ধরাতল সমাকীর্ণ–
ছিন্ন হয়েছে বন্ধন বন্দীর
হে গম্ভীর॥

রবীন্দ্র সংগীত

বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে

বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে।
স্থলে জলে নভতলে বনে উপবনে
নদীনদে গিরিগুহা-পারাবারে
নিত্য জাগে সরস সঙ্গীতমধুরিমা,
নিত্য নৃত্যরসভঙ্গিমা।–

নব বসন্তে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি মঞ্জুল, অতি মঞ্জুল, শুনি মঞ্জুল গুঞ্জন কুঞ্জে–
শুনি রে শুনি মর্মর পল্লবপুঞ্জে,
পিককূজন পুষ্পবনে বিজনে,
মৃদু বায়ুহিলোলবিলোল বিভোল বিশাল সরোবর-মাঝে
কলগীত সুললিত বাজে।
শ্যমল কান্তার-’পরে অনিল সঞ্চারে ধীরে রে,
নদীতীরে শরবনে উঠে ধবনি সরসর মরমর।
কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা॥

আষাঢ়ের নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি গম্ভীর, অতি গম্ভীর নীল অম্বরে ডম্বরু বাজে,
যেন রে প্রলয়ঙ্করী শঙ্করী নাচে।
করে গর্জন নির্ঝরিণী সঘনে,
হেরো ক্ষুব্ধ ভয়াল বিশাল নিরাল পিয়ালতমালবিতানে
উঠে রব ভৈরবতানে।
পবন মল্লারগীত গাহিছে আঁধার রাতে,
উন্মাদিনী সৌদামিনী রঙ্গভরে নৃত্য করে অম্বরতলে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা।

আশ্বিনে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি নির্মল, অতি নির্মল, অতি নির্মল উজ্জ্বল সাজে
ভুবনে নব শারদলক্ষ্মী বিরাজে।
নব ইন্দুলেখা অলকে ঝলকে,
অতি নির্মল হাসবিভাসবিকাশ আকাশনীলাম্বুজ-মাঝে
শ্বেত ভুজে শ্বেত বীণা বাজে –
উঠিছে আলাপ মৃদু মধুর বেহাগতানে,
চন্দ্রকরে উল্লসিত ফুল্লবনে ঝিল্লিরবে তন্দ্রা আনে রে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা।

রবীন্দ্র সংগীত

আমি চঞ্চল হে

আমি চঞ্চল হে,
আমি সুদূরের পিয়াসি।

দিন চলে যায়, আমি আনমনে
তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে–
ওগো, প্রাণে মনে আমি যে তাহার
পরশ পাবার প্রয়াসী।

ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর,
তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি–
মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই
সে কথা যে যাই পাশরি।।

আমি উন্মনা হে,
হে সুদূর, আমি উদাসী।
রৌদ্র-মাখানো অলস বেলায়
তরুমর্মরে ছায়ার খেলায়
কী মুরতি তব নীল আকাশে
নয়নে উঠে গো আভাসি।
হে সুদূর, আমি উদাসী।

ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর,
তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি–
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার
সে কথা যে যাই পাশরি॥

রবীন্দ্র সংগীত

তুমি কি কেবলই ছবি

তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা।
ওই-যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড়,
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি,
তুমি কি তাদের মত সত্য নও। হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি॥
নয়নসমুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই–
আজি তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে–
তব সুর বাজে মোর গানে,
কবির অন্তরে তুমি কবি–
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি॥

রবীন্দ্র সংগীত

তার বিদায়বেলার মালাখানি

তার বিদায়বেলার মালাখানি
আমার গলে রে
দোলে দোলে বুকের কাছে
পলে পলে রে ॥

গন্ধ তাহার ক্ষণে ক্ষণে জাগে ফাগুনসমীরণে
গুঞ্জরিত কুঞ্জতলে রে ॥

দিনের শেষে যেতে যেতে
পথের ’পরে
ছায়াখানি মিলিয়ে দিল বনান্তরে।

সেই ছায়া এই আমার মনে, সেই ছায়া ওই কাঁপে বনে,
কাঁপে সুনীল দিগঞ্চলে রে ॥

রবীন্দ্র সংগীত

যখন ভাঙল মিলন-মেলা

যখন ভাঙল মিলন-মেলা
ভেবেছিলেম ভুলব না আর চক্ষের জল ফেলা ॥

দিনে দিনে পথের ধুলায় মালা হতে ফুল ঝরে যায়–
জানি নে তো কখন এল
বিস্মরণের বেলা ॥

দিনে দিনে কঠিন হল
কখন্‌ বুকের তল–
ভেবেছিলেম ঝরবে না আর আমার চোখের জল।

হঠাৎ দেখা পথের মাঝে, কান্না তখন থামে না যে–
ভোলার তলে তলে ছিল অশ্রুজলের খেলা ॥

রবীন্দ্র সংগীত

এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি

এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি
বিজন ঘরের কোণে, এসো গো।
নামিল শ্রাবণসন্ধ্যা, কালো ছায়া ঘনায় বনে বনে॥

আনো বিস্ময় মম নিভৃত প্রতীক্ষায় যূথীমালিকার মৃদু গন্ধে –
নীলবসন-অঞ্চল-ছায়া
সুখরজনী-সম মেলুক মনে॥

হারিয়ে গেছে মোর বাঁশি,
আমি কোন্‌ সুরে ডাকি তোমারে।

পথ-চেয়ে-থাকা মোর দৃষ্টিখানি
শুনিতে পাও কি তাহার বাণী–
কম্পিত বক্ষের পরশ মেলে কি সজল সমীরণে॥

রবীন্দ্র সংগীত

মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে

মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে সে দিন ভরা সাঁঝে,
যেতে যেতে দুয়ার হতে কী ভেবে ফিরালে মুখখানি–
কী কথা ছিল যে মনে ॥

তুমি সে কি হেসে গেলে আঁখিকোণে–
আমি বসে বসে ভাবি নিয়ে কম্পিত হৃদয়খানি,
তুমি আছ দূর ভুবনে ॥

আকাশে উড়িছে বকপাঁতি,
বেদনা আমার তারি সাথি।

বারেক তোমায় শুধাবারে চাই বিদায়কালে কী বল নাই,
সে কি রয়ে গেল গো সিক্ত যূথীর গন্ধবেদনে ॥

রবীন্দ্র সংগীত

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী,
আমি অবাক্‌ হয়ে শুনি কেবল শুনি॥

সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী॥

মনে করি অমনি সুরে গাই,
কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।

কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে–
হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে,
আমায় তুমি ফেলেছ কোন্‌ ফাঁদে
চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি॥

রবীন্দ্র সংগীত

মম যৌবননিকুঞ্জে গাহে পাখি

মম যৌবননিকুঞ্জে গাহে পাখি–
সখি, জাগ’ জাগ’।
মেলি রাগ-অলস আঁখি–
অনুরাগ-অলস আঁখি সখি, জাগ’ জাগ’ ॥

আজি চঞ্চল এ নিশীথে
জাগ’ ফাগুনগুণগীতে
অয়ি প্রথমপ্রণয়ভীতে,
মম নন্দন-অটবীতে
পিক মুহু মুহু উঠে ডাকি–সখি, জাগ’ জাগ’ ॥

জাগ’ নবীন গৌরবে,
নব বকুলসৌরভে,
মৃদু মলয়বীজনে
জাগ’ নিভৃত নির্জনে।

আজি আকুল ফুলসাজে
জাগ’ মৃদুকম্পিত লাজে,
মম হৃদয়শয়নমাঝে,
শুন মধুর মুরলী বাজে
মম অন্তরে থাকি থাকি– সখি, জাগ’ জাগ’ ॥