পল্লীগীতি

তোমার লাগিয়া রে সদাই প্রাণ আমার

তোমার লাগিয়া রে
সদাই প্রাণ আমার কান্দে বন্ধুরে
প্রাণ বন্ধু কালিয়া রে।।

নিদয় নিঠুর রে বন্ধু
তুই তো কূল নাসা।

(আমায়) ফাঁকি দিয়ে ফেলে গেলি রে বন্ধু।
না পুড়াইলি আশা বন্ধু রে
প্রাণ বন্ধু কালিয়া রে।।

আগে যদি জানতাম রে বন্ধু
তোর বাড়ি নৈরাশা।

(ও তুই) না জেনে পীড়িতের রীতি রে বন্ধু।
ঘটাইলি দুর্দশা বন্ধু রে
প্রাণ বন্ধু কালিয়া রে।।

হৃদয় চিড়িয়া রে দিতাম হৃদয়তে বাসা।
(আমি) তোমায় দেখে স্বাধ মিটাইতাম রে বন্ধু।
খেলতাম প্রেমের পাশা রে বন্ধু
প্রাণ বন্ধু কালিয়া রে।।

পল্লীগীতি

সোনা বন্ধুরে, আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি

সোনা বন্ধুরে, আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি
গগণেতে ডাকে দেয়া আসমান হইল আন্ধিরে বন্ধু
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি

তোমার বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে সুরো নদী
সেই নদীকে মনে হইলো অকুল জলধি রে বন্ধু
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি

গগণেতে ডাকে দেয়া আসমান হইল আন্ধিরে বন্ধু
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি

উইড়া যায় রে ছকুয়ার পঙ্খী
পইড়া রইলো ছায়া
কোন পরাণে বিদেশ হইলা
ভুলি দ্যেশের মায়া রে বন্ধু
আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি।।

পল্লীগীতি

মাঝি বাইয়া যাও রে

মাঝি বাইয়া যাও রে।
অকুল দরিয়ার মাঝে
আমার ভাঙা নাও রে।।

ভেন্না কাষ্ঠের নৌকা খানি।
মাঝখানে তার বুরা

(নৌকার) আগার থাইকা পাছায় গেলে।
গলুই যাবে খইয়া রে।।

দীক্ষা শিক্ষা না হইতে
আগে করছো বিয়া।
(তুমি) বিনে খতে গোলাম হইলে
গাইটের টাকা দিয়া রে।।

বিদেশে বিপাকে যারও
বেটা মারা যায়।
পাড়া-পরশি না জানিয়ে
জানে তারও মা’য়ও রে।।

পল্লীগীতি

নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে

নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে
ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দইরা দিয়া চলুক মাঝ দইরা দিয়া।।

উড়ালি বিড়ালি বাওয়ে নাওয়ের বাদাম নড়ে (আরে)।
আথালি পাথালি পানি ছলাৎ। ছলাৎ করে রে।

আরে খল খলাইয়া হাইসা উঠে
বৈঠার হাতল চাইয়া হাসে, বৌঠার হাতল চাইয়া।।

ঢেউয়ের তালে পাওয়ের ফালে নাওয়ের গলই কাঁপে
তির তিরাইয়া নাওয়ের খৈয়াই রোইদ তুফান মাপে,
মাপে রোইদ তুফান মাপে

চিরলি পিরলি পুলে ভ্রমর-ভ্রমরী খেলে রে (আরে)।
বাদল উদালি কায়ে পানিতে জমিতে হেলে রে

আরে তুর তুরাইয়া আইলো দেওয়া *** হাতে এলইয়া।

শালি ধানের শ্যামলা বনে হইলদা পঙ্খি ডাকে
চিকমিকাইয়া হাসে রে চান সইশা ক্ষেতের ফাকে
ফাকে সইশা ক্ষতের ফাকে

সোনালি রূপালি রঙে রাঙা হইলো নদী (আরে)।
মিতালী পাতাইতাম মুই মনের মিতা পাইতাম যদি রে

আরে ঝিলমিলাইয়া খালর পানি নাচে থৈইয়া থৈইয়া
পানি নাচে থৈইয়া থৈইয়া।।

পল্লীগীতি

আরে ও ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া

আরে ও ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া
আবু ভাইরে কইয়ো আমায় নাইওর নিতো আইয়া
রে ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া

ঐ না ঘাটে বইয়ারে কান্দি দ্যেশের পানে চাইয়া।
চক্ষের পানি নদীর জলে। যাইতাছে মিশিয়া
ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া
আবু ভাইরে কইয়ো আমায় নাইওর নিতো আইয়া
রে ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া

কোন পরাণে আছেরে ভাই আমায় পাষরিয়া।
জঙ্গলারই বাঘের মুখে। গেলনি পাশ দিয়া
ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া
আবু ভাইরে কইয়ো আমায় নাইওর নিতো আইয়া
রে ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া

এই বাইষ্যাতে নাহিরে নিলে গলায় কলসি বাইন্দ্যা।
ঐ না গহিন গাঙ্গের তলায়। মরিবো ডুবিয়া
ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া
আবু ভাইরে কইয়ো আমায় নাইওর নিতো আইয়া
রে ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া

জালালে কয় আর কতদিন থাক রইয়া সইয়া
জল শুকাইলে নিবেরে নাইওর। বাঁশের পালং দিয়া
ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া
আবু ভাইরে কইয়ো আমায় নাইওর নিতো আইয়া
রে ভাটিয়াল গাঙ্গের নাইয়া

পল্লীগীতি

তোরে রাং দিল কি সোনা দিল

তোরে রাং দিল কি সোনা দিল, তুই পরখ কইরে দেখলি না
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা

গুরু দিল খাঁটি সোনা
রাং বইলে তোর জ্ঞান হইল না, ওরে দিনকানা
ওরে উপাসনা বিনে কি তোর মিলিবে রে রুপাসোনা
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা
তোরে রাং দিল কি সোনা দিল

চণ্ডীদাস আর রজকিনী
তারা প্রেমের শিরোমণি, রাং কইরাছে সোনা
তারা এক প্রেমেতে দুইজন মইলো, এমন মরে কয়জনা
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা
তোরে রাং দিল কি সোনা দিল, তুই পরখ কইরে দেখলি না
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না …

পল্লীগীতি

আগে জানি না রে দয়াল

পিড়িতি পিড়িতি বিষম পিড়িতি
করে যে জনে।

দয়াল তোমারও সনে করিয়া
তোমারও সনে দয়াল করিয়া
কান্দিতে জনম গেল রে

আগে জানি না রে দয়াল
তোর পিড়িতে পরাণ যাবে

আঙ্গুল কাঁটিয়া কলম বানাইয়া
নয়নের জলে করলাম কালি।

দয়াল হৃদয় চিড়িয়া লিখন লিখিয়া।
পাঠাইলাম বন্ধুর বাড়িরে
আগে জানি না রে দয়াল
তোর পীড়িতে পরাণ যাবে

সাগর সেচিলাম নগর মাগিলাম
মনিক পাইবার আশে।

দয়াল সাগর শুকালো মানিক লুকালো।
আপন কপালের দোষেরে
আগে জানি না রে দয়াল
তোর পরাণ যাবে।।

পল্লীগীতি

আমি বাংলা মায়ের ছেলে

আমি বাংলা মায়ের ছেলে
জীবন আমার ধন্য যে হায়
জন্ম বাংলা মায়ের কোলে
বাংলা মায়ের ছেলে
আমি বাংলা মায়ের ছেলে

বাংলা মায়ের মুখের হাসি
প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি
মায়ের হাসি পূর্ন শশী- রত্ন-মানিক জ্বলে।

মায়ের তুলনা কি আর ধরণীতে মিলে
মা আমার শস্য-শ্যামলা সুশোভিত ফলে ফুলে
বাংলা মায়ের ছেলে, আমি বাংলা মায়ের ছেলে

গাছে গাছে মিষ্ট ফল, মাঠে ফলে সোনার ফসল
রয়েছে সুশীতল জল, নদী-নালা খালে-বিলে।

কোকিল ডাকে কুহ স্বরে, বুলবুল নাচে ডালে
শুক-সারী গান গায় মা যেন থাকেন কুশলে
বাংলা মায়ের ছেলে, আমি বাংলা মায়ের ছেলে

বাউল আব্দুল করিম বলে, জীবন লীলা সাঙ্গ হলে
শুয়ে থাকবো মায়ের কোলে, তাপ-অনুতাপ ভুলে।

মাকে ভুলে না মায়ের খাঁটি সন্তান হলে
মা বিনে আর কে আছে কার, সুখে-দুখে মা-মা বলে
বাংলা মায়ের ছেলে, আমি বাংলা মায়ের ছেলে।।

পল্লীগীতি

বহু দিনের পিড়িত গো বন্ধু

বহু দিনের পিড়িত গো বন্ধু
একই দিনে ভেঙো না।।

এই যে রে ভাই বংশিওয়ালা
বাজাও বাশী দুপুর বেলা আরো একেলা

তোমার বাশীর সুরে মন হরে গো।
ঘরে রইতে দিল না।।

মাতা মইলো, পিতা রে মইলো
গুণের ভাই ছাড়িয়া রে গেল, সঙ্গে নিল না

আমি কী দোষ দিব পরের পুতের গো।
আপন কর্ম ভালো না।।

বন্ধু আমার আলারে ভোলা
না জানি পীড়িতের জ্বালা আরো একেলা

সে যে আসি বলে গেল চইলে গো।
আর তো ফিরা আইলো না।।

পল্লীগীতি

কেনবা তারে সপে দিলাম প্রাণ

কেনবা তারে সপে দিলাম দেহ মন প্রাণ।
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম দেহ মন প্রাণ।।

তারে প্রাণ সপিয়া হইলেম অপমান।
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম প্রাণ
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম দেহ মন প্রাণ

আগে যদি জানতাম মনে
যাইতাম না তার নয়ন কোণে
মর্মস্থলে হানে পঞ্চবান, প্রান সখীরে।

ও তার বানে কত শক্তি ধরে
সাধ্য কী আর রইতে ঘরে

বানে বিদ্ধ করে অবলার প্রাণ।
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম প্রাণ
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম দেহ মন প্রাণ।।

সে যেন কী মন্ত্র জানে শুকরিয়া বাঁশীর তানে
শুনলে কানে হইতে হয় অজ্ঞান, প্রান সখীরে।
কেন তারে করিস না মানা সময় চিনে কেন বাঁশী বাজায় না

আমার প্রেম যমুনায় বহিছে উজান।
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম প্রাণ
প্রান সখীরে কেনবা তারে সপে দিলাম দেহ মন প্রাণ।।

পল্লীগীতি

দোল দোল দোলনী রাঙা মাথার চিরুনী

দোল দোল দোলনী রাঙা মাথার চিরুনী
এনে দেব হাট থেকে মান তুমি মরো না

নতুন নতুন খোপাটি তুলে এনে দোপাটি
রাঙা ফিতায় বেধে দিবো মান তুমি করো না।।

চেয়ে দেখ ডালিম ফুলে ঐ জমেছে মৌ
বউ কথা কও ডাকছে পাখি, কয় না কথা বউ।

ঝুমঝুমি মল পায়েতে গয়না সোনার গায়েতে
আরো দেবো নাকের নোলক মান তুমি করো না।।

চাঁদের সাথে নিত্যরাতে তাঁরায় কথা কয়
আপনজনা পর হইলে তাও কী প্রানে সয়।

একটু খানি আসনা কাছে এসে বসো না
এনে দেবো রেশমি চুড়ি মান তুমি করো না।।

পল্লীগীতি

এই যে দুনিয়া

এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া
এত যত্নে গড়াইয়াছেন সাঁই

ছায়া বাজী পুতুল রূপে বানাইয়া মানুষ।
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কি দোষ।
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি।
তুমি খাওয়াইলে আমি খাই আল্লাহ।

তুমি বেস্ত তুমি দোজখ তুমি ভাল মন্দ
তুমি ফুল তুমি ফল তুমি তাতে গন্ধ।
আমার মনে এই আনন্দ।
কেবল আল্লাহ তোমায় চাই আমি।

তুমি হাকিম হইয়া হুকুম কর পুলিশ হইয়া ধর
সর্প হইয়া দংশন কর ওঝা হইয়া ঝাড়
তুমি বাঁচাও তুমি মার।
তুমি বীনে কেহ নাই আল্লাহ, তুমি বীনে কেহ নাই।।

পল্লীগীতি

মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম বড় আশা করে

(কোনদিন ঘর বাইন্দোনা মেঘনার চরে আমীরকে সে এক পলকে পথের ফকির করে)

মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম বড় আশা করে
সে ঘর আমার ভাইঙ্গা গেল সর্বনাশা ঝড়ে রে
মেঘনার সর্বনাশা ঝড়ে

এই ঘরে মোর ছেইলা মাইয়া
থাইকা গেছে দেখি চাইয়া রে।

আমি আজো তাদের খুইজা বেড়াই নদীর চরে চরে
মেঘনা নদীর চরে চরে।।

সর্বহারা হইলাম তবু শেষ হইল না আশা
আমার আমি ঘর বান্ধিলাম *** দুরাশা

আবার যখন বান ডাকিল আমার সব ভাসাইয়া নিল রে।
আমি একলা এখন ঘুইড়া বেড়াই
চোখের পানি ঝরেরে আমার, চোখের পানি ঝরে।।

পল্লীগীতি

আর কতকাল ভাসবো আমি

আর কতকাল ভাসবো আমি
দুঃখের সারী গাইয়া
জনম গেল ঘাটে ঘাটে আমার
জনম গেল ঘাটে ঘাটে
ভাঙা তরী বাইয়া রে আমার
ভাঙ্গা তরী বাইয়া।।

পরের বোঝা বইয়া বইয়া
নৌকার গলুই গেছে খইয়ারে।
আমার নিজের বোঝা কে বলিবে রে।
রাখবো কোথায় যাওয়ারে আমি
রাখবো কোথায় যাওয়া।।

এই জীবনে দেখলাম নদীর
কতই ভাঙা গড়া
আমার দেহতরী ভাঙলো শুধু
না জাগিলো চড়া

আমার ভবে কেউ কি আছে
দুঃখ কবো তাহার কাছে রে
আমি রইলাম শুধু দয়াল আল্লাহ রে
আমি রইলাম শুধু দয়াল আল্লাহ
তোমার পানে চাইয়া রে
আমি তোমার পানে চাইয়া।।

পল্লীগীতি

আমার প্রানের প্রান পাখি

আমার প্রানের প্রান পাখি
আমার হিরামন পাখি
তোরে কোথায় রাখি
পাখিরে সবই মিছে আর ফাঁকি।।

পাখিরে .রে রে..এ..এ..
এক পলকের নাই ভরসা
মিছে সকল আশা…..
কখন জানি দারুন ঝড়ে।
ভাঙবে স্বাদের বাসা.. পাখিরে।

ও পাখিরে .রে রে..এ..এ..
কোন বনেরই পাখি তুমি
যাইবা রে কোন বনে
সে কথা কি গেছ ভুলে।
পরে না কি মনে … পাখিরে।।

ও পাখিরে .রে রে..এ..
মিছা মায়ায় বন্দি হইয়া
কর কত খেলা
পশ্চিমে তাকাইয়া দেখ।
ডুইবা আইলো বেলা…. পাখিরে।।