রবীন্দ্র সংগীত

হেথা যে গান গাইতে আসা আমার

হেথা যে গান গাইতে আসা আমার

হয় নি সে গান গাওয়া–

আজো কেবলি সুর সাধা, আমার

কেবল গাইতে চাওয়া।

আমার লাগে নাই সে সুর, আমার

বাঁধে নাই সে কথা,

শুধু প্রাণেরই মাঝখানে আছে

গানের ব্যাকুলতা।

আজো ফোটে নাই সে ফুল, শুধু

বহেছে এক হাওয়া।

আমি দেখি নাই তার মুখ, আমি

শুনি নাই তার বাণী,

কেবল শুনি ক্ষণে ক্ষণে তাহার

পায়ের ধ্বনিখানি।

আমার দ্বারের সমুখ দিয়ে সে জন

করে আসা-যাওয়া।

শুধু আসন পাতা হল আমার

সারাটি দিন ধ’র–

ঘরে হয় নি প্রদীপ জ্বালা, তারে

ডাকব কেমন ক’রে।

আছি পাবার আশা নিয়ে, তারে

হয় নি আমারা পাওয়া।

রাগ: বেহাগ
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1316
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1909
রচনাস্থান: কলকাতা

রবীন্দ্র সংগীত

জাগ’ জাগ’ রে জাগ’ সঙ্গীত–চিত্ত অম্বর কর তরঙ্গিত

জাগ’ জাগ’ রে জাগ’ সঙ্গীত–চিত্ত অম্বর কর তরঙ্গিত,

নিবিড়নন্দিত প্রেমকম্পিত হৃদয়কুঞ্জবিতানে ॥

মুক্তবন্ধন সপ্তসুর তব করুক বিশ্ববিহার,

সূর্যশশিনক্ষত্রলোকে করুক হর্ষ প্রচার।

তানে তানে প্রাণে প্রাণে গাঁথ’ নন্দনহার।

পূর্ণ কর’ রে গগন-অঙ্গন তাঁর বন্দনগানে ॥

রাগ: দেশ
তাল: তেওরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1316
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1909

রবীন্দ্র সংগীত

রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি বেলাশেষের তান

রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি বেলাশেষের তান।

পথে চলি, শুধায় পথিক ‘কী নিলি তোর দান’ ॥

দেখাব যে সবার কাছে এমন আমার কী-বা আছে,

সঙ্গে আমার আছে শুধু এই কখানি গান ॥

ঘরে আমার রাখতে যে হয় বহু লোকের মন–

অনেক বাঁশি, অনেক কাঁসি, অনেক আয়োজন।

বঁধুর কাছে আসার বেলায় গানটি শুধু নিলেম গলায়,

তারি গলার মাল্য ক’রে করব মূল্যবান ॥

রাগ: পিলু
তাল: ত্রিতাল
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1320
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
রচনাস্থান: শিলাইদহ

রবীন্দ্র সংগীত

কেন তোমরা আমায় ডাকো, আমার মন না মানে

কেন তোমরা আমায় ডাকো, আমার মন না মানে।

পাই নে সময় গানে গানে ॥

পথ আমারে শুধায় লোকে, পথ কি আমার পড়ে চোখে,

চলি যে কোন্‌ দিকের পানে গানে গানে ॥

দাও না ছুটি, ধর ত্রুটি, নিই নে কানে।

মন ভেসে যায় গানে গানে।

আজ যে কুসুম-ফোটার বেলা, আকাশে আজ রঙের মেলা,

সকল দিকেই আমায় টানে গানে গানে ॥

রাগ: হাম্বীর
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1320
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
রচনাস্থান: কলকাতা

রবীন্দ্র সংগীত

তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি

তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি

গানের সুরে ॥

যেমনি নয়ন মেলি যেন মাতার স্তন্যসুধা-হেন

নবীন জীবন দেয় গো পুরে গানের সুরে ॥

সেথায় তরু তৃণ যত

মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতো।

আলোক সেথা দেয় গো আনি

আকাশের আনন্দবাণী,

হৃদয়মাঝে বেড়ায় ঘুরে গানের সুরে ॥

রাগ: ভৈরবী
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১৭ আশ্বিন, ১৩২১
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ৪ অক্টোবর, ১৯১৪
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন

রবীন্দ্র সংগীত

কূল থেকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে

কূল থেকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে,

সাগর-মাঝে ভাসিয়ে দিলেম পালটি তুলে ॥

যেখানে ঐ কোকিল ডাকে ছায়াতলে

সেখানে নয়,

যেখানে ঐ গ্রামের বধূ আসে জলে

সেখানে নয়,

যেখানে নীল মরণলীলা উঠছে দুলে

সেখানে মোর গানের তরী দিলেম খুলে ॥

এবার, বীণা, তোমায় আমায় আমরা একা–

অন্ধকারে নাইবা কারে গেল দেখা॥

কুঞ্জবনের শাখা হতে যে ফুল তোলে

সে ফুল এ নয়,

বাতায়নের লতা হতে যে ফুল দোলে

সে ফুল এ নয়–

দিশাহারা আকাশ-ভরা সুরের ফুলে

সেই দিকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে ॥

রাগ: বেহাগ
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১৯ আশ্বিন, ১৩২১
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ৬ অক্টোবর, ১৯১৪
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন

রবীন্দ্র সংগীত

তোমারই ঝরনা তলার নির্জনে

তোমারই ঝরনা তলার নির্জনে
মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোন্‌ ক্ষণে।

রবি ওই অস্তে নামে শৈলতলে,
বলাকা কোন্‌ গগনে উড়ে চলে–

আমি এই করুণ ধারার কলকলে
নীরবে কান পেতে রই আনমনে
তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে।।

দিনে মোর যা প্রয়োজন বেড়াই তারি খোঁজ করে,
মেটে বা নাই মেটে তা ভাবব না আর তার তরে

সারাদিন অনেক ঘুরে দিনের শেষে
এসেছি সকল চাওয়ার বাহির-দেশে

নেব আজ অসীম ধারার তীরে এসে
প্রয়োজন ছাপিয়ে যা দাও সেই ধনে
তোমারই ঝরনাতলার নির্জনে।।

রবীন্দ্র সংগীত

যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে

যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে

তারা কথার বেড়া গাঁথে কেবল দলের পরে দলে ॥

একের কথা আরে

বুঝতে নাহি পারে,

বোঝায় যত কথার বোঝা ততই বেড়ে চলে ॥

যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর

তাদের সবার সুরে সবাই মেলে নিকট হতে দূর।

বোঝে কি নাই বোঝে

থাকে না তার খোঁজে,

বেদন তাদের ঠেকে গিয়ে তোমার চরণতলে ॥

রাগ: খাম্বাজ
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): 1325
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1918

রবীন্দ্র সংগীত

আমার সুরে লাগে তোমার হাসি

আমার সুরে লাগে তোমার হাসি,
যেমন ঢেউয়ে ঢেউয়ে রবির কিরণ দোলে আসি।।

দিবানিশি আমিও যে ফিরি তোমার সুরের খোঁজে,
হঠাৎ এ মন ভোলায় কখন তোমার বাঁশি।।

আমার সকল কাজই রইল বাকি,
সকল শিক্ষা দিলেম ফাঁকি।

আমার গানে তোমায় ধরব ব’লে উদাস হয়ে যাই যে চলে,
তোমার গানে ধরা দিতে ভালোবাসি।।

রবীন্দ্র সংগীত

তোমার নয়ন আমায় বারে বারে বলেছে গান গাহিবারে

তোমার নয়ন আমায় বারে বারে বলেছে গান গাহিবারে ॥

ফুলে ফুলে তারায় তারায়

বলেছে সে কোন্‌ ইশারায়

দিবস-রাতির মাঝ-কিনারায় ধূসর আলোয় অন্ধকারে।

গাই নে কেন কী কব তা,

কেন আমার আকুলতা–

ব্যথার মাঝে লুকায় কথা, সুর যে হারাই অকূল পারে ॥

যেতে যেতে গভীর স্রোতে ডাক দিয়েছ তরী হতে।

ডাক দিয়েছ ঝড়-তুফানে

বোবা মেঘের বজ্রগানে,

ডাক দিয়েছ মরণপানে শ্রাবণরাতের উতল ধারে।

যাই নে কেন জান না কি–

তোমার পানে মেলে আঁখি

কূলের ঘাটে বসে থাকি, পথ কোথা পাই পারাবারে ॥

রাগ: তিলক কামোদ
তাল: খেমটা – ষষ্ঠী
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): আশ্বিন, ১৩২২
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): অক্টোবর, ১৯১৫
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন

রবীন্দ্র সংগীত

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান
তার বদলে আমি চাই নে কোনো দান।।

ভুলবে সে গান যদি নাহয় যেয়ো ভুলে
উঠবে যখন তারা সন্ধ্যসাগরকূলে,

তোমার সভায় যবে করব অবসান
এই ক’দিনের শুধু এই ক’টি মোর তান।।

তোমার গান যে কত শুনিয়েছিলে মোরে
সেই কথাটি তুমি ভুলবে কেমন করে?

সেই কথাটি, কবি, পড়বে তোমার মনে
বর্ষামুখর রাতে, ফাগুন-সমীরণে–

এইটুকু মোর শুধু রইল অভিমান
ভুলতে সে কি পার ভুলিয়েছ মোর প্রাণ।।

রবীন্দ্র সংগীত

তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী

তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী,

অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।

সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,

সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,

পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে,

বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।

মনে করি অমনি সুরে গাই,

কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।

কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে;

হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে;

আমায় তুমি ফেলেছ কোন্‌ ফাঁদে

চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি!
রাগ: খাম্বাজ
তাল: কাহারবা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১০ ভাদ্র, ১৩১৬
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1909
স্বরলিপিকার: ভীমরাও শাস্ত্রী, এ. এ. বাকে

রবীন্দ্র সংগীত

তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়

তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে

দেবে কি গো বাসা আমায় একটি ধারে?।

আমি শুনব ধ্বনি কানে,

আমি ভরব ধ্বনি প্রাণে,

সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে ॥

আমার নীরব বেলা সেই তোমারি সুরে সুরে

ফুলের ভিতর মধুর মতো উঠবে পুরে।

আমার দিন ফুরাবে যবে,

যখন রাত্রি আঁধার হবে,

হৃদয়ে মোর গানের তারা উঠবে ফুটে সারে সারে ॥

রবীন্দ্র সংগীত

সুরের গুরু, দাও গো সুরের দীক্ষা

সুরের গুরু, দাও গো সুরের দীক্ষা
মোরা সুরের কাঙাল, এই আমাদের ভিক্ষা।।

মন্দাকিনীর ধারা,উষার শুকতারা,
কনকচাঁপা কানে কানে যে সুর পেল শিক্ষা।।

তোমার সুরে ভরিয়ে নিয়ে চিত্ত
যাব যেথায় বেসুর বাজে নিত্য।

কোলাহলের বেগে ঘুর্ণি উঠে জেগে
নিয়ো তুমি আমার বীণার সেইখানেই পরীক্ষা।।

রবীন্দ্র সংগীত

কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা

কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা,

তারি মধ্যে চিরজীবন বইব গানের ডালা–

এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা

সুরের-গন্ধ-ঢালা?।

তাই কি আমার ঘুম ছুটেছে, বাঁধ টুটেছে মনে,

খ্যাপা হাওয়ার ঢেউ উঠেছে চিরব্যথার বনে,

কাঁপে আমার দিবানিশার সকল আঁধার আলা!

এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা

সুরের-গন্ধ-ঢালা?।

রাতের বাসা হয় নি বাঁধা দিনের কাজে ত্রুটি,

বিনা কাজের সেবার মাঝে পাই নে আমি ছুটি।

শান্তি কোথায় মোর তরে হায় বিশ্বভুবন-মাঝে,

অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে।

নিত্য রবে প্রাণ-পোড়ানো গানের আগুন জ্বালা–

এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা

সুরের-গন্ধ-ঢালা?।