নজরুল গীতি

শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এল না

শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এল না
বরষা ফুরায়ে গেল আশা তবু গেল না।

ধানী রং ঘাগরি, মেঘ–রং ওড়না
পরিতে আমারে মাগো, অনুরোধ ক’রো না
কাজরির কাজল মেঘ পথ পেল খুঁজিয়া
সে কি ফেরার পথ পেল না মা, পেল না।।

আমার বিদেশিরে খুঁজিতে অনুক্ষণ
বুনো হাঁসের পাখার মত উড়ু উড়ু করে মন।

অথৈ জলে মাগো, মাঠ–ঘাট থৈ থৈ
আমার হিয়ার আগুন নিভিল কই?
কদম–কেশর বলে, ‘কোথা তোর কিশোর’,
চম্পাডালে ঝুলে শূন্য দোলনা।।

আধুনিক

সুন্দরীগো দোহাই দোহাই মান করোনা

সুন্দরীগো দোহাই দোহাই
মান করোনা
আজ নিশিথে কাছে থাকো
না বলো না

অনেক শিখা পুড়ে তবে
এমন প্রদীপ জ্বলে
অনেক কথার মরণ হলে
হৃদয় কথা বলে
না না
চন্দ্রহারে কাজলধোঁয়া
জল ফেলোনা

একেই তো এই জীবন ভরে
কাজের বোঝাই জমে
আজ পৃথিবীর ভালোবাসার
সময় গেছে কমে
একটু ফাগুন আগুন দিয়ে
না জ্বেলোনা

নজরুল গীতি

এসো বঁধু ফিরে এসো, ভোলো ভোলো অভিমান

এসো বঁধু ফিরে এসো, ভোলো ভোলো অভিমান।
দিব ও চরণে ডারি মোর তনু-মন-প্রাণ॥

জানি আমি অপরাধী তাই দিবানিশি কাঁদি,
নিমিষের অপরাধের কবে হবে অবসান॥

ফিরে গেলে দ্বারে আসি বাসি কিনা ভালোবাসি,
কাঁদে আজ তব দাসী, তুমি তার হৃদে ধ্যান॥

ফিরিয়া আসিয়া হেথা দিয়ো দুখ দিয়ো ব্যথা,
সহে না এ নীরবতা হে দেবতা পাষাণ॥

নজরুল গীতি

বাহির দুয়ার মোর বন্ধ হে প্রিয়

বাহির দুয়ার মোর বন্ধ হে প্রিয়,
মনের দুয়ার আজি খোলা,
সেই পথে এসো হে মোর চিতচোর,
হে দেবতা পথ ভোলা।।

সেথা নাহি কুল-লাজ, কলংক ভয়,
নাহি গুরুজন গঞ্জনা নিরদয় ।।
তাই গোপন মানস তমাল কুঞ্জে
বাঁধিয়াছি ঝুলন দোলা।।

মোর অন্তরে বহে সদা অন্তঃসলিলা অশ্রু নদী,
সেই যমুনার তীরে কর তুমি লীলা নিরবধি ।।
সে মিলন মন্দিরে জাগাবেনা কেহ,
তব দেহে বিলীন হবে মোর দেহ,
অনন্ত বাসর শয্যা রচিয়া অনন্ত মিলনে রহিবো উতলা।।

বাহির দুয়ার মোর বন্ধ হে প্রিয়,
মনের দুয়ার আজি খোলা,
সেই পথে এসো হে মোর চিতচোর,
হে দেবতা পথ ভোলা।।

নজরুল গীতি

আমি কৃষ্ণচূড়া হতাম যদি হতাম ময়ূর পাখা

আমি কৃষ্ণচূড়া হতাম যদি হতাম ময়ূর পাখা (সখা হে)
তোমার বাঁকা চূড়ায় শোভা পেতাম ওগো শ্যামল বাঁকা ।।

আমি হলে গোপীচন্দন শ্যাম, অলকা-তিলকা হতাম;
শ্যাম, ও চান্দমুখে অলকা-তিলকা হতাম।
শ্রীঅঙ্গের পরশ পেতাম হ’লে কদম শাখা ।।

আমি বৃন্দাবনে বন-কুসুম হতাম যদি কালা,
কণ্ঠ ধ’রে ঝ’রে যেতাম হয়ে বনমালা ।।

আমি নূপুর যদি হতাম হরি/ কাঁদতাম শ্রীচরণ ধরি
ব্রজবুলি হলে রইত বুকে চরণ-চিহ্ন আঁকা।।

নজরুল গীতি

নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়

নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়
কে যায় কে যায় কে যায়
যেন জলে চলে থল-কমলিনী
ভ্রমর নূপুর হয়ে বোলে পায় পায়।

কলসে কঙ্কনে রিনিঠিনি ঝনকে
চমকায় উন্মন চম্পা বনকে
দলিত অঞ্জন নয়নে ঝলকে
পলকে খঞ্জন হরিণী লুকায়।

অঙ্গের ছন্দে পলাশ মাধবী অশোক ফোটে
নূপুর শুনি বনতুলসীর মঞ্জরী উলসিয়া ওঠে।

মেঘ বিজড়িত রাঙা গোধূলি
নামিয়া এল বুঝি পথ ভুলি
তাহার অঙ্গ তরঙ্গ বিভঙ্গে
কুলে কুলে নদীজল উথলায়।।

নজরুল গীতি

সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি

সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে।
অনুরাগ–কুম্কুম দিলে দেহে মনে, বুকে প্রেম কেন নাহি দিলে।।

বাঁশি বাজাইয়া লুকালে তুমি কোথায় —
যে ফুল ফোটালে সে ফুল শুকায়ে যায়
কী যেন হারায়ে প্রাণ করে হায় হায় —
কী চেয়েছিলে — কেন কেড়ে নাহি নিলে।।

জড়ায়ে ধরিয়া কেন ফিরে গেলে বল কোন্ অভিমানে,
কেন জাগে নাকো আর সে মাধুরী রস–আনন্দ–প্রাণে।

তোমারে বুঝি গো বুঝেছিনু আমি ভুল
এসেছিলে তুমি ফোটাতে প্রেম–মুকুল,
কেন আঘাত করিয়া প্রিয়তম, সেই ভুল নাহি ভাঙাইলে।।

নজরুল গীতি

কবি সবার কথা কইলে

কবি, সবার কথা কইলে, এবার নিজের কথা কহ।১
(কেন) নিখিল ভুবন অভিমানের আগুন দিয়ে দহ।।

কে তোমারে হান্‌ল হেলা, কবি!
(হায়!) সুরে সুরে আঁক কি গো সেই বেদনার ছবি?
কা’র বিরহ রক্ত ঝরায় বক্ষে অহরহ।।

কোন্‌ ছন্দময়ীর ছন্দ দোলে আমার গানে গানে,
তোমার সুরের স্রোত ব’য়ে যায় কাহার প্রেমের টানে গো –
কাহার চরণ পানে?

কাহার গলায় ঠাঁই পেল না ব’লে
(তব) কথার মালা ব্যথার মত প্রতি হিয়ায় দোলে,
(তোমার) হাসিতে যে বাঁশি বাজে, সে ত’ তুমি নহ।।

নজরুল গীতি

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল
আজো তার ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি তন্দ্রাতে বিলোল।।

আজো হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী বায় ঝুরছে নিশি-দিন
আসেনি দখনে হাওয়া গজল গাওয়া মোমাছি বিভোল।।

কবে সে ফুল কুমারী ঘোমটা চিরি’, আসবে বাহিরে
শিশিরের স্পর্শ-সুখে ভাঙবে রে ঘুম রাঙবে রে কপোল।

ফাগুনের মুকুল-জাগা দু’কূল ভাঙা আসবে ফুলেল বান
কুঁড়িদের ওষ্ঠ পুটে লুটবে হাসি ফুটবে গালে টোল।।

কবি তুই গন্ধে ভুলে ‘ ডুবলি জলে কূল পেলিনে আর
ফুলে তোর বুক ভ’রেছিস আজকে জলে ভররে আঁখির কোল।।

নজরুল গীতি

নম: নম: নম: বাংলাদেশ মম

নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম
চির-মনোরম চির-মধুর।
বুকে নিরবধি বহে শত নদী
চরণে জলধির বাজে নূপুর॥

গ্রীষ্মে নাচে বামা কাল-বোশেখী ঝড়ে,
সহসা বরষাতে কাঁদিয়া ভেঙে পড়ে,
শরতে হেসে চলে শেফালিকা-তলে
গাহিয়া আগমনী গীতি বিধুর॥

হরিত অঞ্চল হেমন্তে দুলায়ে
ফেরে সে মাঠে মাঠে শিশির-ভেজা পায়ে,
শীতের অলস বেলা পাতা ঝরার খেলা
ফাগুনে পরে সাজ ফুল-বধূর॥

এই দেশের মাটি জল ও ফুলে ফলে
যে রস যে সুধা নাহি ভূমন্ডলে,
এই মায়ের বুকে হেসে খেলে সুখে
ঘুমাব এই বুকে স্বপ্নাতুর॥

আধুনিক

দুটি পাখী দুটি তীরে

দুটি পাখি দুটি তীরে
মাঝে নদী বহে ধীরে।

একই তরু শাখা পরে-
ছিল বাসা লীলা ছলে,
অজানা সে কোন ঝড়ে-
ভেঙে নিল বাসাটিরে।

বিধাতার আভিশাপ
নিয়তির হল জয়,
ছিঁড়িল বীণার তার
মুছে গেল পরিচয়।

ছিল যেথা আলো হাসি
ফুলফল মধু বাঁশি,
আজি সেথা কিছু নাহি
বায়ু কেঁদে যায় নীড়ে।

নজরুল গীতি

পরাণ প্রিয় কেন এলে অবেলায়

রান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়।
শীতল হিমেল বায়ে ফুল ঝরে যায়॥

সেদিনও সকাল বেলা
খেলেছি কুসুম-খেলা,
আজি যে কাঁদি একেলা
এ ভাঙা মেলায়,
কেন এলে অবেলায়॥

ক্লান্ত দিবস দূরে
কাঁদিছে পিলুর সুরে,
কেন শত পথ ঘুরে
আসিলে হেথায়॥

নজরুল গীতি

এত জল ও কাজল চোখে

এত জল ও – কাজল চোখে
পাষানী আনলে বল কে ?
টলমল জল মোতির মালা
দুলিছে ঝালর –পলকে ।।

দিল কি পুব – হাওয়াতে দোল ,
বুকে কি বিঁধিল কেয়া ?
কাঁদিয়া কুটিরে গগন
এলায়ে ঝামর অলকে।।

চলিতে পৈচি কি হাতের
বাধিল বৈচি কাটাতে ?
ছাড়াতে কাচুলির কাঁটা
বিধিল হিয়ার ফলকে ।।

যে দিনে মোর দেওয়া – মালা
ছিঁড়িলে আনমনে সখি ,
জড়াল যুঁই – কিসুমী – হাড়
বেণীতে সেদিন গুলো কে ।।

যে পথে নীর ভরণে যাও
বসে রই সে পথ – পাশে
দেখি নিত কার পানে চাহি
কলসীর সলিল ছলকে ।।

মুকুলী মন সেধে সেধে
কেবলি ফিরিনু কেদে ,
সরসীর ঢেউ পলায় ছুটি
না ছুতেই নলিন – নোলকে ।।

বুকে তোর সাত সাগরের জল
পিপাসা মিটল না কবি ,
ফটিক – জল ! জল খুঁজিস যেথায়
কেবলি তড়িৎ ঝলকে ।।